জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে হিমালয়, পৃথিবী পরিবর্তনের বড় ইঙ্গিত
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
৩০-০৮-২০২৬ ০৩:৫৫:৩০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
৩০-০৮-২০২৬ ০৩:৫৫:৩০ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে হিমালয়ের পরিবেশ। গলছে হিমবাহ, কমছে বরফ ও তুষার, বাড়ছে পাথরধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি। নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও পাকিস্তানের কারাকোরাম অঞ্চলে পরপর প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা হিমালয়ের পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বুধবার নেপালের তিব্বত সীমান্তের কাছে ২৩ হাজার ৭৩৪ ফুট উঁচু লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর পাশে হিমবাহ ও পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে। এর ফলে পানি, কাদা ও পাথরের বিশাল স্রোত প্রায় ৬০ মাইল পথজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিকে তুষারধসে ১০ জন পর্বতারোহী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন নেপালের বিখ্যাত পর্বতারোহী নির্মল পুরজা। দুটি ঘটনা মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ঘটেছে এবং উভয় ঘটনাই হিমালয় ও কারাকোরাম অঞ্চলে বরফ ও তুষারের দ্রুত পরিবর্তনের বিষয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক আরবিন্দ্র খাড়কা বলেন, হিমালয়ের হিমবাহগুলো বছরে গড়ে প্রায় এক মিটার বরফ হারাচ্ছে। তার ভাষায়, সমস্যা শুধু এভারেস্টে সীমাবদ্ধ নয়; পুরো হিমালয়ই বরফ হারাচ্ছে।
বরফ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু পর্বতারোহণেই পড়ছে না, বদলে যাচ্ছে পাহাড়ি এলাকার স্বাভাবিক ভূপ্রকৃতিও। নেপাল ন্যাশনাল মাউন্টেন গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তুল সিং গুরুং বলেন, হিমালয়ের অনেক এলাকায় তুষার ও বরফ সরে গিয়ে খালি পাথর বেরিয়ে পড়ছে। ফলে এমন অনেক পথ এখন আর আগের মতো চেনা যাচ্ছে না। পাহাড়ের প্রায় প্রতিটি এলাকায় পাথরধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লাংটাংয়ের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে হিমবাহের কোনো অংশ ভেঙে পড়ার পর ঢিলা পাথর ও ধ্বংসাবশেষ বরফ গলা ভেজা মাটির ওপর দিয়ে নিচে নেমে গিয়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করে থাকতে পারে।
হিমালয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নেপালের অর্থনীতিরও বড় সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশটির মোট অর্থনীতির ৬ দশমিক ১ শতাংশ পর্যটন খাত থেকে আসে। ২০২৩ সালে এ খাতে প্রায় ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ছিল, যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ১৫ শতাংশ।
২০২৫ সালে ১১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক নেপাল সফর করেন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি পর্যটকের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ট্রেকিং ও পর্বতারোহণ। এ খাত ঘিরে দেশটিতে ৩ হাজারের বেশি ট্রেকিং এজেন্সি এবং বিপুলসংখ্যক গাইড, পোর্টার, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও হেলিকপ্টার সেবা গড়ে উঠেছে।
পর্বতারোহণ নেপালের জন্য বড় আয়ের উৎসও। চলতি বছরের বসন্ত মৌসুমে ৩১টি পর্বতে ওঠার জন্য ১ হাজার ১৯৫ জন পর্বতারোহী অনুমতি নিয়েছেন। এ থেকে সরকার প্রায় ৯০ লাখ ডলার রয়্যালটি পেয়েছে। শুধু এভারেস্টে বিদেশি পর্বতারোহীদের বসন্তকালীন অনুমতিপত্রের মূল্য ১৫ হাজার ডলার।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতও ঝুঁকিতে পড়ছে। অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা জানিয়েছেন, তারা গত দুই দশকে পাহাড়ের চেহারায় বড় পরিবর্তন দেখেছেন। এভারেস্টের খুম্বু আইসফলেও বরফের ফাটল ও বরফের কাঠামো আগের তুলনায় বদলে গেছে। ২০০৪ সালে সেখানে অসংখ্য ফাটল পার হতে অ্যালুমিনিয়ামের মই ব্যবহার করতে হতো। চলতি বছর কিছু অংশে মাত্র দুটি জায়গায় মইয়ের প্রয়োজন হয়েছে।
তবে নতুন প্রযুক্তি কিছুটা ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করছে। পর্বতারোহীরা এখন উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস, জিপিএস, তুষারধস শনাক্তকারী যন্ত্র, হালকা সরঞ্জাম ও ড্রোন ব্যবহার করছেন। ড্রোনের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছানো এবং বিপজ্জনক এলাকা আগে থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ড্রোনের ব্যবহার বিশেষ করে নেপালি শেরপা ও অন্যান্য স্থানীয় কর্মীদের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ বিদেশি পর্বতারোহীরা যেখানে কয়েকবার বিপজ্জনক বরফাঞ্চল পার হন, স্থানীয় কর্মীদের তাঁবু, অক্সিজেন, খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে একই পথ বারবার অতিক্রম করতে হয়।
নেপালের পাহাড়ে পর্যটন ও পর্বতারোহণ আবারও শুরু হবে। শরতের ট্রেকিং মৌসুম সামনে। অনেক অভিযান ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়েছে। গাইড, পোর্টার, হোটেল ও লজ মালিকরা সেই মৌসুমের ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু পরিবর্তিত জলবায়ু ও অস্থিতিশীল পাহাড় তাদের সামনে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
মার্কিন পর্বতারোহী ডেভ ওয়াটসনের মতে, এভারেস্টের চূড়াতেও বরফের পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়টি পৃথিবীর সামগ্রিক পরিবর্তনের একটি বড় ইঙ্গিত। তাঁর ভাষায়, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ যদি এতটা বরফ হারায়, তাহলে পৃথিবীর কোনো স্থানই এই পরিবর্তনের বাইরে নেই।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স